বিদায় ২০১৩। স্বাগতম ২০১৪। ২০১৩ সালকে বিদায় দিয়ে ২০১৪ সালকে স্বাগত জানাচ্ছে প্রত্যেকটি মানুষ। নতুন শপথ আর নতুন স্বপ্নে বিভোর হয়েই প্রত্যেকটি মানুষ নিজের পুরনো জীর্ণতাকে পিছনে ফেলছে। সাফল্য ও ব্যর্থতার বছরটি পাড় করে নতুন বছরকে নতুন করে রাঙ্গিয়ে নেবার প্রত্যয় সবার। বাং
লাদেশ ক্রিকেটেরও আরেকটি সফল বছরের সমাপ্তি হল। সফল সমাপ্তি এই অর্থে বলা যে, এই বছরে প্রাপ্তির পাল্লা অনেকাংশে সমৃদ্ধ। ক্রিকেটের গায়ে স্পট ফিক্সিং নিয়ে কালিমা লেপন হলেও টাইগারদের সাফল্যে তাও চাপা পড়ে যায়। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ টেস্ট খেলেছে ছয়টি। দেশের মাটিতে খেলেছে দুটি টেস্ট। আর বাহিরে খেলেছে চারটি। ছয় টেস্টে তিনটি ড্র করে মুশফিকের বাংলাদেশ। আর একটি জয়ের বিপরীতে হার রয়েছে দুটিতে। অন্যদিকে রঙ্গিণ জার্সিতে বাংলাদেশ মাঠে নামে নয়টি ম্যাচে। শ্রীলংকার মাটিতে একটি জয়ের পর জিম্বাবুয়ের মাটিতেও একটি ম্যাচ জিতে টাইগাররা। এরপর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঘরের মাটিতে তিনটি জয় করে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে নয় ম্যাচে টাইগারদের জয় পাঁচটি ম্যাচে। ক্রিকেট আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একটি বিঙ্গাপণ। সাকিব-তামিমের মতো তারকারা আজ বিশ্বে বিভিন্ন জায়গায় খেলতে যাচ্ছে। পেশাদারিত্বের ক্রিকেটে এখন সবাই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে ব্যস্ত। তাইতো বছর শেষে ক্রিকেটারদের আর ক্রিকেট বোর্ডের সকল পারফরমেন্স মূল্যায়ন করে সালতামামি করাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সালতামামি ২০১৩
বিপিএল ২০১৩
২০১৩ সালে বাংলাদেশের ক্রিকেট যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) দিয়ে। ১৮ জানুয়ারী মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচে মুখোমুখি হয় ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটসের ও খুলনা রয়েল বেঙ্গলস। সাত দলের অংশগ্রহণে টুর্নামেন্ট ৩১ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয় পরের মাসের ১৯ ফেব্রুয়ারী। ম্যাচে চিটাগং কিংসকে ৪৩ রানে হারিয়ে শিরোপা ঘরে তুলে ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরস। প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়নও হয় ঢাকা গ্ল্যাডিয়েটরস।
বিসিএল ফাইনাল : চ্যাম্পিয়ন ‘ওয়ালটন সেন্ট্রাল জোন’
বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ (বিসিএল)র প্রথম আসরের চ্যাম্পিয়ন হয় ‘ওয়ালটন সেন্ট্রাল জোন’। বিপিএলের একদিন পরই টুর্নামেন্টের ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। ফাইনালটি হয় দিবারাত্রির। বিসিবি নর্থ জোনের মুখোমুখি হয় ওয়ালটন সেন্ট্রাল জোন। গোলাপি বলে প্রথম শিরোপা জয়েও ইতিহাস হয়ে থাকে ওয়ালটন সেন্ট্রাল জোন। ৭৪ রানে পরাজিত হয় বিসিবি নর্থ জোন। টুর্নামেন্টে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় তারা।
শ্রীলংকা সফর
বাংলাদেশ জাতীয় দল ২০১৩ সালের মার্চ মাসে প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে মাঠে নামে। আট মার্চ মুশফিকবাহিনী শ্রীলংকার গল মাঠে প্রথম টেস্ট ম্যাচে মুখোমুখি হয়। সুনামী আক্রান্ত গলে শ্রীলংকার জেতার রেকর্ড ৯০ ভাগ। সেখানে বাংলাদেশ পাঁচদিন লড়াই করে শ্রীলংকার বিপক্ষে ড্র করে। ইতিহাস গড়ে মুশফিক,আশরাফুল,নাসির। গল টেস্টের তৃতীয় দিনে আশরাফুল ১৮৯ রান করেন, যা বাংলাদেশির মধ্যে সর্বোচ্চ। বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে যে কোন দলের বিপক্ষে হাজার রানের মাইলস্টোনে প্রথম পা রাখেন আশরাফুল ( ১২ ম্যাচে ১০৪৭ রান)। কিন্তু চতুর্থ দিন পাল্টে যায় রেকর্ড। অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম প্রথম বাংলাদেশি হয়ে টেস্ট ম্যাচে শতক হাকান। এরপর নাসির হোসেন ক্যারিয়ারের প্রথম শতক তুলে নেন। সাফল্যে ভরা গল টেস্টের পর কলম্বোতে বাংলাদেশ সাত উইকেটে পরাজিত হয়। টেস্টের সাফল্যের পর ওয়ানডে সিরিজের সাফল্য পায় টাইগাররা। তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ ১-১ সমতায় শেষ হয়। বৃষ্টির কারণে দ্বিতীয় ম্যাচটি ভেস্তে যায়। এর আগে প্রথম ম্যাচে ডর্ক লুইস পদ্ধতিতে শ্রীলংকা আট উইকেটের জয় পায়। তৃতীয় ম্যাচে বাংলাদেশও ডর্ক লুইস পদ্ধতিতে তিন উইকেটের জয় পায়। সফরের একমাত্র টি-২০ ম্যাচেও ছিল টাইগারদের দাপট। শ্রীংলংকা আগে ব্যাট করে ১৯৮ রান জমা করে। জবাবে বাংলাদেশ ১৮১ রানের বেশি করতে পারেনি। শর্ট ফরম্যাটের ম্যাচগুলোকে অনভিঙ্ঘ বাংলাদেশের এই রানই বা কম কিসের।
জিম্বাবুয়ে সফর
শ্রীলংকা সফরের রেশ না কাটতে কাটতেই নয় দিনের ব্যবধানে জিম্বাবুয়ে উড়ে যায় টাইগাররা। সফরের প্রথম ম্যাচে টাইগারা দুমড়ে মচড়ে গেলেও দ্বিতীয় টেস্টে ঘুরে দাঁড়ায় তারা। প্রথম টেস্ট জিম্বাবুয়ে জিতে নেয় ৩৩৫ রানের বিশাল ব্যবধানে। এরপর দ্বিতীয় টেস্ট টাইগাররা জিতে নেয় ১৪৩ রানে। টেস্টের পর ওয়ানডে সিরিজেও চলে তুমুল যুদ্ধ। তিন ম্যাচ সিরিজের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচ ১২১ রানে জিতে নেয় বাংলাদেশ। এরপর ঘুরে দাড়ায় জিম্বাবুয়ে। দ্বিতীয় ম্যাচে টাইগারদের থেকে ছয় উইকেটের জয় ছিনিয়ে আনে। ১-১ এ সমতায় থাকা ওয়ানডে সিরিজের ফাইনালেও জিম্বাবুয়ে জিতে নেয়। বাংলাদেশকে পরাস্ত করে সাত উইকেটে। ওয়ানডে সিরিজের হারের পর দুই ম্যাচের টি-২০ সিরিজ খেলে দুই দল। সমতায় শেষ হয় দুই দলের লড়াই। ১-১ ব্যবধানে শেষ হয় টি-২০ সিরিজও।
বিপিএল: কলঙ্কিত ক্রিকেট ও নিষিদ্ধ আশরাফুল
২০১৩ সাল। বাংলাদেশের ক্রিকেটের উপর কালিমা লেপে দেন সর্বকনিষ্ঠ টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান মোহাম্মদ আশরাফুল। বিপিএলে স্পট ফিক্সিং করেন তিনি। তার সাথে জড়িয়ে যায় বাংলাদেশের ছয় খেলোয়াড় ও দেশের বাহিরের দুই খেলোয়াড়। পুরো বছর জুড়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের যে সাফল্য সেটা আশরাফুলের এই কৃতি কিছুটা হলেও কুলষিত করেছে দেশের ক্রিকেকে। চলতি বছরের ৪ই জুন। আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগের (আকসু) কাছে ম্যাচ পাতানোর সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন মোহাম্মদ আশরাফুল। বিপিএলে তিনটি ম্যাচ নিয়ে সন্দেহ হয় আকসুর। শুরু হয় তদন্ত। যার চূড়ান্ত ফল- আকসুর কাছে আশরাফুলের দোষ স্বীকার। এমন অবস্থার মধ্যে চলতি বছরের আগস্টের ১৩ তারিখে রাজধানী ঢাকার একটি হোটেলে বিপিএলে ফিক্সিংয়ের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে আকসু। প্রতিবেদনে ফিক্সিংয়ের সঙ্গে ৯ জনের জড়িত থাকার কথা বলা হলেও কারও নাম বলা হয়নি। জড়িদের বিচার কাজ শুরু হয় ২৪ নভেম্বর। ট্রাইব্যুনালের প্রধান সাবেক বিচারপতি খাদেমুল ইসলাম চৌধুরী কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে দিয়ে বিচার কাজ শুরু করেন। আগামী ১৯ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক করা হয়েছে।
বিসিবি নির্বাচন: বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ‘পাপন’
এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন। এবারই প্রথম বিসিবির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছে সরকারি কোন হস্তক্ষেপ ছাড়াই। পরিচালকদের সরাসরি ভোটে বিসিবির বর্তমান সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন নির্বাচনে সভাপতির পদে জয় লাভ করেন। এছাড়া বিসিবির সাবেক সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী অক্টোবরের প্রথম দিন নির্বাচন বয়কট করেন। ১২ অক্টোবর দুপুর বারোটায় ২৬ পরিচালকের মধ্যে ২৪ জনের সমর্থন পেয়ে পাপন প্রথম বারের মতো নির্বাচিত সভাপতি হিসাবে বিসিবির দায়িত্ব পান। নির্বাচনে বোর্ড পরিচালনার জন্য সাবেক তিন ক্রিকেটার সহ মোট ২৬ জন পরিচালক নির্বাচিত হন।
সাফল্যমন্ডিত বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড হোম সিরিজ
ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ডকে হারানো একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে টাইগারদের। ওয়ানডে শেষ কবে নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশকে হারিয়েছে সেটাও অনেকের অজানা। এ বছরে নিউজিল্যান্ডকে আবারো আমন্ত্রণ জানিয়েছে ওয়ানডে সিরিজ জিতে নেয় বাংলাদেশ। ৩-০ ব্যবধানে সিরিজ পরাজিত হয় অতিথীদল নিউজিল্যান্ড। এর আগে টেস্ট সিরিজে দাপট দেখিয়ে ড্র করে টাইগাররা। বাংলাদেশ নিউজিল্যান্ড সিরিজে মুমিনুলের ১৮১ ও ১২৬ রানের দুই ইনিংস, সোহাগ গাজী সেঞ্চুরিসহ হ্যাটট্রিক ও রুবেল হোসেনের হ্যাটট্রিক টাইগারদের সাফল্যের পিছনে বড় অবদান রাখে। টেস্ট ও ওয়ানডে সিরিজে আশানুরূপ পারফরমেন্সের পর একমাত্র টি-২০ ম্যাচে টাইগাররা পরাজিত হয়। তবে সেই পরাজয়েও টাইগারদের লড়াই করার মনোভাব প্রকাশ পায়।
ওয়ালটন প্রিমিয়ার লিগ: নতুন চ্যাম্পিয়ন ‘গাজী ট্যাংক’
একাধিক তারিখ পেছানোর পর ক্রিকেট বোর্ড ও সিসিডিএম আয়োজন করে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসার প্রিমিয়ার লিগ। ১২টি ক্লাবের অংশগ্রহণে দশ সেপ্টেম্বর প্রিমিয়ার লিগ মাঠে গড়ায়। লিগের শুরুতেই স্পন্সর পেয়ে যায় বোর্ড। ২০১২-১৩ আসরের প্রিমিয়ার লিগের টাইটেল স্পন্সর হয় ‘ওয়ালটন’। হরতাল ও অবরোধে আটকে থাকার পর গত ৩০ নভেম্বর শিরোপা নিশ্চিত করে গাজী ট্যাংক। প্রাইম দোলেশ্বরকে ৬০ রানে হারিয়ে প্রথম বারের মতো শিরোপার স্বাদ নেয় লুৎফর রহমান বাদলের গাজী ট্যাংক ক্রিকেটার্স।
বিশ্বকাপ ভেন্যুতে সবুজ সংকেত ও কাউন্ট ডাউন
ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে টি-২০ বিশ্ব আসর। প্রায় সাতবার বিশ্বকাপ ভেন্যুগুলো পরিদর্শন করেন আইসিসির পরিদর্শক দল। অবশেষে টি-২০ বিশ্বকাপের ভেন্যু গুলোকে ডিসেম্বর শেষ পরিদর্শন করেন তারা। আর পরিদর্শন শেষেই সবুজ সংকেত দেয় স্টেডিয়ামগুলোকে। এরপর গত পাঁচ ডিসেম্বর ঢাকা,চট্টগ্রাম ও সিলেটে একই সঙ্গে তিনটি শহরে জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ১০০ দিনের কাউন্ট ডাউন শুরু হয়।
উৎকন্ঠায় এশিয়া কাপ ও টি-২০ বিশ্বকাপ
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে হুমকির মুখে দেশের ক্রিকেট অঙ্গন। জানুয়ারিতে শ্রীলঙ্কা ক্রিকেট দলের সফর। বাংলাদেশ- শ্রীলঙ্কা সিরিজ শেষ হলেই চার জাতির এশিয়া কাপ। এরপর শর্ট ফরমেটের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। সব মিলিয়ে জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্রিকেট অঙ্গন নানা রঙে রাঙিয়ে থাকবে। কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পরিস্থীতিতে হুমকিতে রয়েছে বাংলাদেশের আয়োজক হবার সম্ভাবনা।
টি-২০ বিশ্বকাপের প্রস্তুতি
টি-২০ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বাংলাদেশ এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করছে। বিশ্বকাপ আগামী বছর মার্চে। ক্রিকেটারদের শর্ট ফরম্যাটে অভ্যস্ত করানোর জন্যই বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড(বিসিবি) ক্রিকেটর নিয়ে চ্যালেঞ্জ কাপ ও বিজয় দিবস টি-২০ দুটি টুর্নামেন্ট আয়োজন করেছে। ১১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ জাতীয় দল ও এ দলের সমন্বয়ে দুটি দল নিয়ে ৩ ম্যাচের চ্যালেঞ্জ কাপ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর বছরের শেষ দিকে আবাহনী, মোহামেডান, প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাব ও ইউসিবি-বিসিবি একাদশ নিয়ে ২২ ডিসেম্বর শুরু হয়েছে বিজয় দিবস টি-২০ টুর্নামেন্ট। ৩১ ডিসেম্বর টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে। টুর্নামেন্টের ফাইনালে লড়বে তামিমের ইউসিবি-বিসিবি একাদশ ও সাকিবের প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাব।