আর মাত্র কয়েকটি ঘন্টা। এরপর ক্রিকেটের ব্যাটিং ইশ্বর শচীন রমেশ টেন্ডুলকার ২০০তম টেস্ট খেলে বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন। যেখানে থেকে শুরু সেখান থেকেই শেষ করছেন। মুম্বাইয়ের ছেলে শচীন ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ খেলবেন। ২২ গজে
র ক্রিজে ২৪ বছর শাসন করা এই ক্রিকেটার সাদা জার্সির টেস্ট ক্রিকেটে ১৯৯ ম্যাচে করেছেন ১৫,৮৪৭ রান। ৫১ শতকের সাথে রয়েছে ৬৭ টি অর্ধশতক হাঁকানোর বিরল রেকর্ডও। ওয়ানডেতেও বজায় রেখেছেন একচ্ছত্র আধিপত্য। ৪৬৩টি ম্যাচ খেলেছেন শচীন। সবচেয়ে বেশি ওয়ানডে খেলার রেকর্ডও তার । সব চেয়ে বেশি ১৮৪২৬ রানের রেকর্ড শচীনের। ওয়ানডে সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরিও তার দখলে ৪৯টি হাফ সেঞ্চুরি ৯৬ টি। এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ২০০ রানের মাইল ফলক তার। তিনিই প্রথম এক ইনিংসে ২০০ রান করার কৃতিত্ব দেখান। ২৪ বছরের ক্যারিয়ারে ভারতকে অনেক মূল্যবান জয়ও উপহার দেয়া শচীনকে নিয়ে পাঠকদের অনেক আগ্রহ। খেলার জগতের পাঠকদের জন্যে শচীনকে নিয়ে বিশেষ আয়োজন।
শচীনের পরিবার: ১৯৭৩ সালের ২৪ এপ্রিল মুম্বাইতে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শচীন। শচিনের বাবা রমেশ টেন্ডুলকার ছিলেন মারাঠি ভাষার একজন জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক। তিনি সংগীত পরিচালক শচীন দেব বর্মণের খুব ভক্ত ছিলেন। তাঁর নাম অনুসারেই শচীনের নাম রাখেন তিনি। চার ভাই বোনের মাঝে শচীন সবার ছোট। ২২ বছর বয়সে নিজের থেকে ৫ বছরের বড় মেয়ে অঞ্জলিকে বিয়ে করেন শচীন। শচীনের শ্বশুড় ছিলেন আন্তর্জাতিক ব্রিজ চ্যাম্পিয়ন। শচীন ও অঞ্জলির ঘরের রয়েছে দুই সন্তান। কন্যা সারা ও পুত্র অর্জুন টেন্ডুলকার। বাবার মতো অর্জুনও অল্প বয়স থেকে ক্রিকেট খেলা শুরু করেছেন। এর মধ্যে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৭ ও ১৯ দলে খেলেছেন অর্জুন।
ক্যারিয়ারের শুরুর ঘটনা: শচীন টেন্ডুলকারের অভিষেক হয়েছিল ১৯৮৯ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে করাচি টেস্টে । একই বছরে পাকিস্তানের বিপক্ষে ডিসেম্বরে ওয়ানডে অভিষেক হয়েছে তাঁর। এর আগে যখন ক্রিকেট খেলা শুরু করেন তখন তিনি পেসার হতে হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শচীনের উচ্চতা কম থাকায় অস্ট্রেলিয়ার সাবেক পেসার ডেনিস লিলি তাকে বোলার হিসেবে সুযোগ দেননি। এরপর বোম্বের অনুর্ধ্ব১৫ দলের হয়ে জায়গা হয় শচীনের। দলে জায়গা হবার পর দিলিপ ভেংসরকার শচীনকে একটি ব্যাট উপহার দেন। আর ক্যাম্পে থাকা কালীন সময়ে শচীন তাঁর গুরু সুনীল গাভাস্কারের থেকে পেয়েছিলেন আল্ট্রা লাইট প্যাড।
ক্যারিয়ারের প্রথম শতক : লিটল মাস্টার প্রথম শতক হাঁকিয়েছেন শ্রদ্ধাশ্রম বিদ্যামন্দিরের হয়ে। এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গণে ১৯৮৯ সালে নভেম্বরে টেস্ট অভিষেকের পর ১৯৯০ সালে ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি করেন তিনি। এছাড়া ১৯৯৪ সালে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরিও করেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শ্রীলংকার প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে অভিষেক শতক করেন তিনি। এজন্য অপেক্ষা করেন ৭৯টি ম্যাচ। এছাড়া ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম শতক হাঁকান শচীন ১৯৯৩ সালে। ক্রিকেটে ইতিহাসে ওয়ানডে ম্যাচে প্রথম দ্বিশতক হাঁকান শচীন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ভারতের মাটিতে ২০০ রান করেন তিনি। যদিও তাঁর সতীর্থ কিছুদিন পরই শেভাগ ২১৯ রানের রেকর্ড গড়েন।
শচীন ও বাংলাদেশ : শচীন ও বাংলাদেশ বেশ ওতপ্রতভাবেই মিশে আছে যা আজীবন থাকবে। ক্যারিয়ারের শততম শতক হাঁকিয়েছেন বাংলাদেশের বিপক্ষে বাংলাদেশের মাটিতে। ২০১২ সালে ১৬ মার্চ এশিয়া কাপে বাংলাদেশের বিপক্ষে ১১৪ রান করেন শচীন। এরপর ক্যারিয়ারের শেষ ওয়ানডে ম্যাচও খেলেছেন বাংলাদেশের মাটিতে। পাকিস্তানের বিপক্ষে ২০১২ সালে ১৮ মার্চ শেষ ওয়ানডে ম্যাচ খেলেন মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে। টেস্ট ক্রিকেটেরও সর্বোচ্চ রান করেছেন বাংলাদেশের বিপক্ষে। ২০০৪ সালে ডিসেম্বরে বাংলাদেশ সফরে এসে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ২৪৮ রান করেন তিনি।
ব্যবসায়িক প্রাপ্তি: টেন্ডুলকারের অসম্ভব জনপ্রিয়তার দারুণ অতীতের যে-কোন চুক্তিকে ছাড়িয়ে নিয়ে যায়। ক্রিকেটে তার অবদানকে পুঁজি করে ১৯৯৫ সালে ওয়ার্ল্ডটেলের সাথে ৩০ কোটি রূপিতে চুক্তিবদ্ধ হন। পরবর্তীতে ২০০১ সালে আবারো ৫ বছরের জন্য নবায়ণ করেন ৮০ কোটি রূপির বিনিময়ে। ২০০৬ সালে সাচি এন্ড সাচি’র সাথে ১৮০ কোটি রূপিতে তিন বছর মেয়াদী চুক্তি করেন। টেন্ডুলকার তাঁর জনপ্রিয়তাকে ব্যবহার করে দু’টি রেস্টুরেন্ট হিসেবে – টেন্ডুলকার’স কোলাবা মুম্বাই এবং শচীন’স মুলুন্দ মুম্বাই চালু করেন। মার্স রেস্টুরেন্টের মালিক সঞ্জয় নারাং এর সাথে উক্ত রেস্টুরেন্টগুলো যৌথভাবে পরিচালিত করছেন। এছাড়াও, তিনি ব্যাঙ্গালোরে শচীন’স নামে নতুন একটি রেঁস্তোরা চালু করবেন। ২০০৭ সালে টেন্ডুলকার ফিউচার গ্রুপ এবং মানিপাল গ্রুপের সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চার গ্রুপ প্রতিষ্ঠা করেন যা স্বাস্থ্যসেবা এবং খেলাধূলায় শারীরিক সক্ষমতার লক্ষ্যে পণ্য উৎপাদনে আসার ঘোষণা দেন। পণ্যটির নাম হবে ‘এস ড্রাইভ এন্ড সাচ’। ভার্জিন কমিকের পরিবেশনায় শচীনকে মহাবীর প্রদর্শন করে কমিক বই প্রকাশের পরিকল্পনা নিয়েছে।
টুকরো ইতিহাসে শচীন ঃ
১৭ বছর বয়সে স্ত্রী অঞ্জলির সাথে প্রথম দেখা হয় শচীনের। এরপর ৫ বছর প্রণয়ের পর বিয়ে করেন অঞ্জলিকে।
১৯৮৭ সালে বিশ্বকাপে বল বয় ছিলেন শচীন
প্রথম বিশ্বকাপ জয়ী ভারতের অধিনায়ক কাপিল দেবেল শততম টেস্টে অভিষেক হয়েছে শচীনের।
ওয়ানডে অভিষেকে ০ রানে আউট হন শচীন।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ১৯৯২ সালে থার্ড আম্পায়ারের প্রচলন শুরু করে আইসিসি। আর থার্ড আম্পায়ারের প্রথম শিকান হন শচীন।
রাহুল দ্রাবিড়ের সাথে ২০টি শতরানের জুটি গড়েছেন শচীন।
শচীনের ক্রিকেটে ব্যাগে সবসময় থাকতো জাতীয় পতাকা।
লন্ডনের মাদাম তুসো জাদুঘরে শচীনের মোমের মূর্তি রয়েছে।
শচীন প্রায় ২৫টি বিঙ্ঘাপনী কোম্পানীর সাথে যুক্ত রয়েছেন।
১৯৯৫ সালে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রিকেটার হিসেবে শচীনের নাম যুক্ত করেন ওয়ার্ল্ডটেল।